অমিত শাহের নতুন বিল: স্বচ্ছতা নাকি রাজনৈতিক অস্ত্র?
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সভাপতি সমীক ভট্টাচার্য ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কলকাতায় এক জনসভায়, শুক্রবার, ২২ আগস্ট ২০২৫। (ছবি: পিটিআই) |
ভারতের সংসদে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে নতুন বিলটি উপস্থাপন করেছেন, তা নিয়ে গোটা রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিলের মূল বক্তব্য হলো— প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যদি এমন কোনো গুরুতর অপরাধে অভিযোগ ওঠে যার শাস্তি পাঁচ বছরের বেশি হতে পারে এবং সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত চলাকালীন অন্তত ৩০ দিনের জন্য তিনি জেলে থাকেন, তবে ৩১তম দিনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মন্ত্রিত্ব চলে যাবে। তবে কারাদণ্ড শেষে জামিনে মুক্তি পেলে আবার তিনি পুনরায় মন্ত্রীত্ব ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রথম শোনায় আইনটি সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই ইতিবাচক মনে হতে পারে। কারণ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অপরাধী ও দুর্নীতিবাজদের উপস্থিতি নিয়ে বহুদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। জনগণ চায় স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। তাই এই বিলকে যদি শুধু আক্ষরিক অর্থে দেখা হয়, তবে মনে হতে পারে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু রাজনীতি কখনোই শুধু কালো–সাদা চিত্রে আবদ্ধ থাকে না। এর মধ্যেই থাকে ধূসরতা, গোপন উদ্দেশ্য ও কৌশলের জাল। সেই কারণেই এই বিল ঘিরে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সত্যিই দুর্নীতি ও অপরাধ দূর করার সৎ প্রচেষ্টা, নাকি বিরোধী দলগুলোকে দুর্বল করার জন্য বিজেপির তৈরি নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র?
বিলের মূল কাঠামো
অমিত শাহ যে বিলটি পেশ করেছেন, তার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্ত্রিত্ব হারানো’র নিয়ম। এখন পর্যন্ত ভারতের সংবিধানে বা অন্য কোনো আইনে স্পষ্ট করে বলা নেই যে, একজন মন্ত্রী গ্রেপ্তার হলে তার পদ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইস্তফা দিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, গুরুতর অভিযোগে মন্ত্রী গ্রেপ্তার হলেও তিনি পদে বহাল থাকেন অথবা রাজনৈতিক চাপের মুখে অনেক দেরিতে পদত্যাগ করেন। এই বিল সেই ফাঁকফোকর বন্ধ করার দাবি করছে।
তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি শর্ত—মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, যদি তাকে ৩০ দিনের বেশি সময় ধরে কারাগারে রাখা হয়, তবে তার পদ চলে যাবে। অর্থাৎ, বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই একজন জনপ্রতিনিধির রাজনৈতিক অবস্থান নড়ে যাবে। এখানেই শুরু হচ্ছে বিতর্ক।
বিজেপির যুক্তি: দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি
বিজেপি নেতারা বলছেন, এই বিল আসলে ভারতের রাজনীতিকে অপরাধমুক্ত করার এক সাহসী উদ্যোগ। তাদের বক্তব্য—
- দেশের মানুষ বহুদিন ধরেই অভিযোগ করছে যে দুর্নীতিবাজরা ক্ষমতার আসনে বসে যায় এবং প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত সুবিধা ভোগ করে।
- আইনের ফাঁক ব্যবহার করে অনেকেই দীর্ঘদিন পদে থেকে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেন।
- নতুন আইন কার্যকর হলে অন্তত সেই সময়ে পদ থেকে অপসারণ ঘটবে এবং জনজবাবদিহিতা তৈরি হবে।
- বিজেপির দাবি, এই আইন কারও জন্য বিশেষভাবে নয়; কংগ্রেস, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি কিংবা বিজেপি—সব দলের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
অমিত শাহ সংসদে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, “জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে রাজনীতিকে পরিষ্কার রাখা জরুরি। যদি কোনো নেতা সত্যিই নির্দোষ হন, তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার মন্ত্রিত্ব ফিরে পাবেন। কিন্তু অন্তত জনগণ বুঝতে পারবে, আইনের চোখে সবাই সমান।”
বিরোধীদের অভিযোগ: রাজনৈতিক ফাঁদ
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, এই বিলের আড়ালে বিজেপি আসলে নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করতে চাইছে। অভিযোগগুলো হলো—
-
সংস্থার অপব্যবহার
বিরোধীরা বলছে, ইডি (Enforcement Directorate) ও সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই বিজেপির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, তারা বিজেপিতে যোগ দিলেই হঠাৎ করেই ‘ক্লিনচিট’ পেয়ে যান। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে থাকলে মামলার পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া হয়। -
অজিত পাওয়ারের উদাহরণ
মহারাষ্ট্রের এনসিপি নেতা অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে জোট করার পর সেই অভিযোগ প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে যায়। একইভাবে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও থাকা মামলা কার্যত থমকে যায়। -
হিমন্ত বিশ্বশর্মার ঘটনা
আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিরুদ্ধেও একসময় বিজেপি নিজেই দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিতেই সব অভিযোগ থেমে যায়। -
বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিন’ ইমেজ
বিরোধীদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অন্তত ২৫ জন শীর্ষ নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৩ জনের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির মামলা ছিল, কিন্তু যোগদানের পরই প্রায় সবাই অভিযোগমুক্ত হয়ে যান। তাই বিজেপিকে বিরোধীরা ব্যঙ্গ করে বলছে ‘ওয়াশিং মেশিন’, যেখানে প্রবেশ করলেই দাগ ধুয়ে যায়। -
রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া
বিরোধীদের আশঙ্কা, এই বিল পাশ হলে বিরোধী শাসিত রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে ৩০ দিন জেলে রাখলেই সরকার ভেঙে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে গণতান্ত্রিক সরকারকে অস্থিতিশীল করার পথ সুগম হবে।
আইনি প্রশ্ন
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলটি একাধিক সংবিধানগত প্রশ্ন তুলে দেয়।
- প্রথমত, ভারতীয় সংবিধানে ‘নির্দোষ ধরা হবে যতক্ষণ না দোষ প্রমাণিত হয়’—এটি একটি মৌলিক নীতি। অথচ এই বিলে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই একজন মন্ত্রীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
- দ্বিতীয়ত, তদন্ত সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইডি–সিবিআই-এর সফলতার হার মাত্র ১%। অর্থাৎ অধিকাংশ মামলাই শেষ পর্যন্ত আদালতে টিকতে পারে না। তাহলে কি শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার করলেই একজন জনপ্রতিনিধির মন্ত্রিত্ব হারানো উচিত?
- তৃতীয়ত, এই আইনের মাধ্যমে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে কি গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হবে না?
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি বারবার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে সামনে তুলে ধরছে। “না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।” স্লোগান দিয়ে তারা ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছিল। কিন্তু বাস্তবে বিজেপি বিরোধী নেতাদের দলে টেনে নেওয়ার পরই তাদের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির মামলা স্তিমিত হয়ে যায়। ফলে বিজেপির এই স্লোগান ধীরে ধীরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে অমিত শাহের নতুন বিল অনেকটা দ্বিমুখী বার্তা বহন করছে। একদিকে এটি জনগণকে দেখাচ্ছে যে বিজেপি এখনও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর। অন্যদিকে বিরোধীদের ভয় দেখাচ্ছে যে, যদি তারা বিজেপির বিরুদ্ধে বেশি শক্ত অবস্থান নেয় তবে সহজেই জেলে পাঠিয়ে মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া যাবে।
বিজেপির ভেতরেও আশঙ্কা
শুধু বিরোধী শিবির নয়, বিজেপির ভেতরেও অনেক নেতা নীরবে আতঙ্ক প্রকাশ করছেন। কারণ আইনটি পাশ হলে তা বিজেপির মন্ত্রীদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। ভবিষ্যতে যদি ক্ষমতার ভারসাম্য বদলায় এবং অন্য কোনো দল কেন্দ্রীয় সংস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয়, তবে এই একই অস্ত্র বিজেপির বিরুদ্ধেও ব্যবহার হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি ‘দুই ধারওয়ালা তরবারি’ হয়ে উঠতে পারে।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিল আসলে ভারতের গণতন্ত্রের সামনে এক নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে— স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা জরুরি, কিন্তু তার নামে যদি বিচারপ্রক্রিয়ার আগে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়, তবে নির্বাচিত সরকারের স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়তে পারে।
একজন মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীকে যদি সত্যিই অপরাধী প্রমাণ করা যায়, তবে তাকে অপসারণে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু প্রমাণের আগেই কেবল গ্রেপ্তারের ভিত্তিতে পদচ্যুত করা হলে এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি
এই মুহূর্তে লোকসভায় বিজেপির কাছে এই বিল পাশ করানোর মতো দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নেই। তাই নিকট ভবিষ্যতে এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশেষ সময়ে বিরোধীদের চাপ দেওয়ার জন্য এই বিলকে ব্যবহার করা হতে পারে। এটি মূলত এক ধরনের ‘সিগন্যাল’— বিজেপি বিরোধীদের জানিয়ে দিচ্ছে, যে কোনো সময় কঠোর আইন এনে তাদের বিপাকে ফেলা সম্ভব।
অমিত শাহের নতুন বিল নিয়ে বিতর্ক তাই বহুস্তরীয়। জনগণের একাংশ মনে করছে, এটি দুর্নীতি কমানোর জন্য সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু বিরোধী দল ও সমালোচকরা একে রাজনৈতিক অস্ত্র ছাড়া আর কিছু ভাবছে না। ভারতের মতো বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশে আইন যদি সত্যিই স্বচ্ছতা আনার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা হতে হবে নিরপেক্ষ ও সংবিধানসঙ্গত। নইলে এটি একসময় গণতন্ত্রকে দুর্বল করার হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
সুতরাং, প্রশ্ন একটাই— এই বিল কি সত্যিই জনগণের স্বার্থে তৈরি, নাকি রাজনৈতিক দাবা খেলায় আরেকটি কৌশল মাত্র? ভবিষ্যতের রাজনীতি সেই উত্তর দেবে।