জনগণ সার্টিফিকেট দেবে, প্রধানমন্ত্রী নয়? হাইকোর্টের রায়ে নতুন বিতর্কের ঝড়
Prime Minister Narendra Modi. | Photo Credit: ANI |
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে তথ্য অধিকার আইন (RTI) এর আওতায় তাদের ডিগ্রি ও মার্কশিট জনসমক্ষে আনার দাবি উঠলেও, শেষ পর্যন্ত দিল্লি হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়েছে—এই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। আদালতের যুক্তি, বিষয়টি ব্যক্তিগত তথ্যের আওতায় পড়ে, এবং তা প্রকাশ করলে “প্রাইভেসি” বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
এমন রায়ের ফলে জনমনে নতুন করে প্রশ্ন জেগেছে—কেন প্রধানমন্ত্রী ও একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য এতটা গোপন রাখা হচ্ছে? বিষয়টি কি শুধুই প্রাইভেসির মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে?
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর হাইকোর্টের রায়
২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন (CIC) এক ঐতিহাসিক রায়ে বলেছিল যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রির রেজিস্টার RTI আবেদনকারী নীরজ শর্মাকে দেখানো হোক। একইভাবে, স্মৃতি ইরানির ১০ম ও ১২শ শ্রেণির মার্কশিটও প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে আদালত স্থগিতাদেশ দেয় এবং অবশেষে ২০২৪ সালে দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি সচিন দত্ত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন—এই তথ্য “জনস্বার্থে” নয়, বরং এটি ব্যক্তিগত তথ্য। আদালতের মতে, একবার এমন তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করলে অযথা “সেনসেশন” ছড়ানোর প্রবণতা বাড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হবে।
অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর প্রধানমন্ত্রী মোদির ডিগ্রির রেকর্ড বা স্মৃতি ইরানির মার্কশিট দেখাতে বাধ্য নয়।
প্রশ্নের ঝড়: ডিগ্রি থাকলে দেখানো হচ্ছে না কেন?
বিরোধী শিবির ও সাধারণ নাগরিকদের বড় প্রশ্ন হলো—যদি প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীর ডিগ্রি সত্যিই বৈধ হয়, তবে তা দেখাতে এত অনীহা কেন?
অনেকের মতে, এ ধরনের তথ্য গোপন রাখা জনবিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, একজন সাধারণ নাগরিক যখন কোনো চাকরির জন্য আবেদন করে, তখন তাকে ১০ম, ১২শ, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পরীক্ষার সমস্ত সার্টিফিকেট জমা দিতে হয়। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যদি তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ না দেখান, তবে তা কি গণতান্ত্রিক নীতি ও স্বচ্ছতার সঙ্গে খাপ খায়?
বিজেপির ব্যাখ্যা ও বিরোধীদের অভিযোগ
২০১৬ সালে যখন প্রথম এই বিতর্ক ওঠে, তখন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ও প্রয়াত অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি একটি প্রেস কনফারেন্স করে প্রধানমন্ত্রী মোদির ডিগ্রির কপি দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ডিগ্রিতেও একাধিক অসঙ্গতি চিহ্নিত করে বিরোধীরা।
- বিএ ডিগ্রি: কপিতে লেখা ছিল ১৯৭৯ সালের। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ডে উল্লেখ আছে, মোদি ১৯৭৮ সালেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গিয়েছিলেন। ব্যাখ্যা দেওয়া হয়—পরীক্ষা আগেই হয়েছিল, তবে সমাবর্তন অনুষ্ঠান হয় ১৯৭৯ সালে।
- নামের অসঙ্গতি: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কপিতে লেখা ছিল “নরেন্দ্র কুমার দামোদর দাস মোদি”, যা সরকারি নথির নামের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
- এমএ ডিগ্রি: বলা হয় মোদি “Entire Political Science” বিষয়ে এমএ করেছেন। বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে—এমন কোনো নামের ডিগ্রি আদৌ আছে কি? বিজেপির জবাব, এর অর্থ হলো তিনি রাজনৈতিক বিজ্ঞানের সব বিষয়েই পরীক্ষা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, স্মৃতি ইরানির ১০ম ও ১২শ শ্রেণির মার্কশিট নিয়ে বহুবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কখনো তিনি নিজের বায়োডাটায় ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন, কখনো আবার ডিগ্রির ধরন ও প্রতিষ্ঠানের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আদালতের রায়ে নতুন বিতর্ক
হাইকোর্টের রায়ের পর বিরোধী দলগুলো সরব হয়েছে। আরজেডি নেতা মনোজ ঝা বলেছেন—“যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী তার শিক্ষাগত যোগ্যতার মতো মৌলিক তথ্য প্রকাশ না করেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—কেন এত গোপনীয়তা?”
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সাগরিকা ঘোষ নিজে তার বিএ ডিগ্রির কপি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে দেখিয়েছেন যে, এতে কোনো সমস্যা নেই। তিনি বলেন, “ডিগ্রিতে নম্বরও লেখা নেই, শুধু ক্লাস উল্লেখ আছে। তাহলে প্রধানমন্ত্রী কেন নিজের কপি দেখাতে পারছেন না?”
স্বচ্ছতা বনাম প্রাইভেসি: আইনি দ্বন্দ্ব
এই মামলায় মূল প্রশ্ন হলো—একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ডিগ্রি কি জনস্বার্থের তথ্য, নাকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আওতায় পড়ে?
আইন বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় হেগড়ে মন্তব্য করেছেন—“ডিগ্রি বা শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কিত তথ্য জনস্বার্থের আওতায় পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো নিয়মিত তাদের শিক্ষার্থীদের ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে, বিজ্ঞপ্তি আকারে দেয়। তাহলে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীর ডিগ্রি প্রকাশে আপত্তি কেন?”
অন্যদিকে আদালত বলেছে, “যে কোনো তথ্য জনগণ জানতে চাইছে মানেই তা জনস্বার্থে নয়।” আদালতের মতে, যদি প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রীকে ঘিরে এমন তথ্য প্রকাশ শুরু হয়, তবে ভবিষ্যতে প্রতিটি নেতা-নেত্রীর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কিত তথ্যের জন্য অসংখ্য আবেদন আসবে। এটি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অসহনীয় চাপ তৈরি করবে।
“চুরি”র অভিযোগে সবসময় ‘প্রাইভেসি’ ঢাল?
সমালোচকদের মতে, যখনই কোনো বিতর্কিত প্রশ্ন ওঠে, তখন সরকার “প্রাইভেসি”র যুক্তি দেখিয়ে এড়িয়ে যায়।
- ডিগ্রির প্রশ্নে: বলা হচ্ছে, এটি ব্যক্তিগত তথ্য।
- ইলেক্টোরাল বন্ডে: কোটি কোটি টাকা কোন শিল্পপতি বা সংস্থা বিজেপিকে দিয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। এখানেও “প্রাইভেসি”র দোহাই দেওয়া হয়েছিল, যদিও পরে সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে।
- ভোট চুরির অভিযোগে: ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি উঠলে বলা হয়—এতে নারীদের প্রাইভেসি লঙ্ঘিত হতে পারে।
অর্থাৎ, সমালোচকদের অভিযোগ—যখনই বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর কোনো প্রশ্ন ওঠে, তখনই “প্রাইভেসি”র ঢাল ব্যবহার করা হয়।
জনআস্থার প্রশ্ন
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু নেতা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু জনগণ তাদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, নেতৃত্বের গুণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশ্ন হলো—ডিগ্রি যদি সত্যিই বৈধ হয়, তবে তা প্রকাশে অনীহা কেন? আর যদি জাল বা অসঙ্গতি থাকে, তবে তা কি দেশের জনগণের জানার অধিকার নয়?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে সাধারণ মানুষকে নাগরিকত্ব প্রমাণে জন্মসনদ, স্কুল সার্টিফিকেট জমা দিতে হয়, সেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতা গোপন রাখা কি ন্যায্য?
রাজনৈতিক অভিঘাত
বিরোধীরা এই ইস্যুকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টি বহুবার প্রশ্ন তুলেছে—যদি ২০১৬ সালে সাংবাদিক সম্মেলনে ডিগ্রি দেখানো হয়, তবে এখন কেন বিশ্ববিদ্যালয় তা জনসমক্ষে আনতে পারছে না?
বিরোধীদের মতে, এটি শুধু ডিগ্রির প্রশ্ন নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
দীর্ঘ লড়াইয়ের পরও জনগণ এখনও জানতে পারল না—প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির ডিগ্রি আসলে কী? বৈধ, নাকি বিতর্কিত? আদালত যেহেতু ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তাই আপাতত সেই তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।
কিন্তু জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়—
- যদি ডিগ্রি বৈধ হয় তবে গোপনীয়তা কেন?
- স্বচ্ছতার দাবি করে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা কি নিজেরাই অস্বচ্ছতার জাল তৈরি করছে?
- আর, নাগরিকদের কাছ থেকে যখন সব তথ্য চাওয়া হয়, তখন দেশের সর্বোচ্চ পদে থাকা নেতাদের ক্ষেত্রে এই দায়বদ্ধতা কেন থাকবে না?
এ প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। তবে স্পষ্ট যে, এই বিতর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।