আমেরিকার অতিরিক্ত ২৫% শুল্কে কাঁপছে ভারতীয় অর্থনীতি: টেক্সটাইল শিল্প ধ্বংসের মুখে, মোদি-অম্বানী দ্বন্দ্বে নতুন মোড়, পররাষ্ট্রনীতিতে ‘চীন কার্ড’ খেলছে কেন্দ্র

আমেরিকার অতিরিক্ত ২৫% শুল্কে কাঁপছে ভারতীয় অর্থনীতি: টেক্সটাইল শিল্প ধ্বংসের মুখে, মোদি-অম্বানী দ্বন্দ্বে নতুন মোড়, পররাষ্ট্রনীতিতে ‘চীন কার্ড’ খেলছে কেন্দ্র
Source: https://www.ft.com/

আমেরিকার অতিরিক্ত ২৫% শুল্কের ধাক্কা

ভারতীয় অর্থনীতি নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫% টেরিফ (শুল্ক) আরোপ করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতের বিভিন্ন শিল্পে, বিশেষ করে টেক্সটাইল খাতে। দেশের প্রধান টেক্সটাইল হাব তিরুপ্পুর, নয়ডা ও সুরাত–এ ইতিমধ্যেই উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একধরনের ডোমিনো ইফেক্ট তৈরি করবে। যখন শিল্প কারখানা বন্ধ হয়, তখন হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। তাদের আয় কমলে মাসিক খরচ কমে যায়। খরচ কমলে বাজারে ভোগ্যপণ্যের বিক্রি কমে যায়। আর বিক্রি কমলে আবার অন্যান্য শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে, প্রভাব কেবল টেক্সটাইলেই সীমাবদ্ধ থাকে না—বরং গোটা অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দেয়।

তবু সরকারের ভেতর থেকে আসছে ভিন্ন সুর—“সব চঙ্গা সি।” কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যখন টেক্সটাইল শহর সুরাত–এর মতো স্থানে উৎপাদন থমকে গেছে, তখন সরকার কেন এতোটা নিশ্চুপ?

মোদি–ভক্তদের ‘ট্রিপল তালাক’

এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করছে। বিজেপি–র অনেক দৃঢ় সমর্থক এখন প্রকাশ্যে হতাশা জানাচ্ছেন। গ্রেটার নয়ডার এক সময়ের বিজেপি ভক্ত প্রকাশ্যে বলেছেন—

“আমেরিকা এক সময় বলত—তুমি কে? আজ আমরা বলছি—তুই কী রে?”

তিনি নিজের ইনস্টাগ্রামে রিল বানিয়ে সরাসরি ঘোষণা করেছেন—“এক্স–বিজেপি সাপোর্টার।”
ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে নিজেকে ভিখারি রূপে উপস্থাপন করছেন, ইঙ্গিত দিচ্ছেন—বিজেপি সমর্থকদের অবস্থা এখন করুণ।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি নিছক কৌতুক নয়, বরং বিজেপি সমর্থকগোষ্ঠীর ভেতরে বাড়তে থাকা অসন্তোষের প্রকাশ।

ট্রাম্প–মোদি কূটনৈতিক ঠান্ডা লড়াই

আরও বড় প্রশ্ন উঠছে মোদি–ট্রাম্প সম্পর্ক নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, তিনি মোদিকে চাপ দিয়েছেন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার জন্য। এমনকি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—

“এমন শুল্ক বসাবো যে তোমার মাথা ঘুরে যাবে।”

ভারতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যখন ধাক্কা খাচ্ছে, তখন এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে দিল্লির জন্য বিব্রতকর।

এদিকে ভারতীয় আইটি সেলের প্রচারে দাবি করা হয়েছে—“ট্রাম্প বারবার মোদিকে ফোন করেছেন, কিন্তু মোদি ফোন ধরেননি।”
বিশ্লেষকদের মতে, এ দাবি বাস্তবসম্মত নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী যেকোনো বিদেশি রাষ্ট্রনেতার ফোন ধরেন। তাই ট্রাম্পের ফোন না ধরা একধরনের কূটনৈতিক বোকামি হতো।

‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বনাম আমদানিনির্ভর বাস্তবতা

এই সংকটের মধ্যেই মোদি আবারো নতুন করে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও ‘আত্মনির্ভর ভারত’ স্লোগান তুলেছেন। উৎসবের মৌসুমে নাগরিকদের কেবল দেশীয় পণ্য কেনার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি।

কিন্তু সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—মোদির ভাষণ শেষ হওয়ার পর তিনি কোন গাড়িতে ওঠেন? রেঞ্জ রোভার, বিএমডব্লিউ কিংবা মার্সিডিজ মেবাখ—যা ভারতের কোনো কারখানায় তৈরি হয় না।
তিনি যে বিমানে ভ্রমণ করেন—বোয়িং ৭৭৭—তাও কি ভারতের দারভাঙায় তৈরি?

অর্থাৎ, বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য।

আম্বানী বনাম মোদি: ব্যবসায়ী–রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এক চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত মিলছে—মোদি ও আম্বানী পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি।

  • অম্বানী পরিবারের বিলাসবহুল চিড়িয়াখানা প্রকল্প ‘ভান্তারা’–র বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট SIT তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। অভিযোগ—প্রাণীদের নির্যাতন ও বিভিন্ন অনিয়ম।
  • এর আগে এসবিআই ও ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া অনিল অম্বানীর রিলায়েন্স কমিউনিকেশনসকে “প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠান” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যে অম্বানী পরিবার এক সময় মোদির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল, তাদের বিরুদ্ধে এখন সরকারি সংস্থার তদন্ত—এটি নিছক কাকতালীয় নয় বলেই রাজনৈতিক মহল মনে করছে।

অবকাঠামো ও শহরের বাস্তব চিত্র

অর্থনৈতিক ধাক্কার পাশাপাশি ভারতের অবকাঠামোগত ব্যর্থতাও উন্মোচিত হচ্ছে। গুরগাঁও–এর একটি ভিডিও আন্তর্জাতিকভাবে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে কিছু বিদেশিকে রাস্তায় জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করতে দেখা যায়। এটি স্বচ্ছ ভারত অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।

স্মার্ট সিটি প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা সুউচ্চ অট্টালিকার পেছনে বাস্তবতা—রাস্তা ভরা আবর্জনা, নালা উপচে পড়া নোংরা জল, কর্পোরেশনের ব্যর্থতা।

অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিজেপির ঘনিষ্ঠ অনেক ব্লগারও প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন—

“শেম অন আস! বিদেশিরা রাস্তা পরিষ্কার করছে আর কর্পোরেশন চুপ।”

চীনকে ঘিরে নতুন রাজনীতি

আমেরিকার সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকায় সরকার এখন চীন–কার্ড খেলতে চাইছে। শিগগিরই মোদি চীন সফরে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে আইটি সেল ও কিছু মিডিয়া চীনের অবকাঠামোর প্রশংসা শুরু করেছে।

কিন্তু সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—

  • গালওয়ান সংঘর্ষের ক্ষত কি মুছে গেছে?
  • পাকিস্তানকে সহায়তা করা চীন হঠাৎ করে বন্ধুত্বের দেশ হয়ে গেল কেন?

যে কংগ্রেসকে বিজেপি বরাবর “চীনা এজেন্ট” বলে আক্রমণ করেছে, এখন সেই একই কাজ সরকার করছে—এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক উঠেছে।

‘অচ্ছে দিন’–এর মরীচিকা

আজ থেকে এক দশক আগে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল ‘অচ্ছে দিন’–এর প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু আজ বাস্তবতা হলো—

  • আমেরিকার শুল্কে অর্থনীতি চাপে,
  • টেক্সটাইল শিল্প কার্যত ভেঙে পড়েছে,
  • সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে,
  • অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে শহরগুলো নোংরা হয়ে যাচ্ছে,
  • রাজনৈতিক–ব্যবসায়ী ঘনিষ্ঠতার ভেতরেই তৈরি হচ্ছে নতুন দ্বন্দ্ব।

ফলে একথা বলাই যায়—
“না সাধারণ মানুষের, না আম্বানীর—কাউকেই এখন আর ভালো দিন স্পর্শ করছে না।”

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url