UPI App কিভাবে আয় করে? ফ্রি পরিষেবার আড়ালে কোটি টাকার ব্যবসা
Source: nextlabs.io |
আজকের দিনে শহর থেকে গ্রাম – সর্বত্রই আমরা একটা পরিচিত শব্দ শুনতে পাই: "Received on PhonePe", "Payment successful on Google Pay", "Money received via Paytm"।
চায়ের দোকানে হোক, বাজারের ভিড়ের মধ্যে হোক, কিংবা ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলে বসে – ইউপিআই (UPI) আসার পর মানুষ আর নগদ টাকা হাতে রাখতে ভুলেই যাচ্ছে। শুধু একটা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট কানেকশন থাকলেই হলো, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে টাকা পৌঁছে যাচ্ছে গন্তব্যে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, Google Pay, PhonePe, Paytm এর মতো বড় কোম্পানিগুলো এই সমস্ত পরিষেবা আমাদের ফ্রি দিচ্ছে। টাকা পাঠাতে নেই কোনো চার্জ, নেই কোনো লুকানো খরচ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে – কোটি কোটি টাকা খরচ করে অ্যাপ তৈরি করা, সার্ভার চালানো, নিরাপত্তা বজায় রাখা, হাজার হাজার কর্মচারীকে বেতন দেওয়া – সবকিছুর পরেও এই কোম্পানিগুলো আয় করছে কীভাবে?
চলুন এবার আমরা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই, ইউপিআই অ্যাপগুলোর আয়ের উৎস এবং তাদের ব্যবসার কৌশল।
ইউপিআই-এর জন্ম ও আমাদের জীবনে এর প্রভাব
UPI বা Unified Payments Interface ২০১৬ সালে ভারতের ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (NPCI) চালু করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে ক্যাশলেস ইকোনমির দিকে এগিয়ে দেওয়া। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এই সিস্টেম ভারতের অর্থনীতিতে বিপ্লব এনেছে।
- ২০২5 সালে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ কোটি লেনদেন হচ্ছে ইউপিআই-এর মাধ্যমে।
- ছোট দোকান থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড – প্রায় সবাই ইউপিআই গ্রহণ করছে।
- নগদ টাকার চাহিদা কমে গিয়ে ডিজিটাল লেনদেনই এখন মূলধারা হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যবস্থাকে ভর করে যারা ব্যবসা করছে – সেই Google Pay, PhonePe, Paytm ইত্যাদি কোম্পানি – তারা লাভবান হচ্ছে কীভাবে?
আয়ের প্রথম উৎস: মার্চেন্ট কমিশন
যখন আমরা কোনো দোকান থেকে পণ্য কিনে ইউপিআই দিয়ে টাকা দিই, আমাদের কাছ থেকে কোনো টাকা কেটে নেওয়া হয় না। কিন্তু দোকানদারদের কাছ থেকে এই কোম্পানিগুলো সামান্য কমিশন আদায় করে।
- সাধারণত ছোট দোকানদারদের থেকে কোনো চার্জ নেওয়া হয় না।
- কিন্তু বড় দোকান, শপিং মল, রেস্তোরাঁ বা অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি ট্রানজ্যাকশনের একটি শতাংশ ফি কোম্পানির পকেটে যায়।
👉 উদাহরণস্বরূপ, ধরুন কোনো বড় শপিং ওয়েবসাইট এক মাসে ১০০ কোটি টাকার লেনদেন ইউপিআই-এর মাধ্যমে করল। সেখানে যদি গড়ে মাত্র ০.৫% কমিশনও ধরা হয়, তাহলে কোম্পানির আয় হবে ৫০ লাখ টাকা।
এছাড়া দোকানে আমরা যে ছোট্ট সাউন্ডবক্স মেশিন দেখি – যা বলে ওঠে “Payment received on PhonePe” – সেই মেশিনের জন্যও মাসে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ দিতে হয় দোকানদারকে। লাখ লাখ দোকান এই মেশিন ব্যবহার করছে, ফলে এখান থেকেও মোটা অঙ্কের আয় হয়।
আয়ের দ্বিতীয় উৎস: ডেটা ও অ্যানালিটিক্স
আজকের যুগে ডেটাই হল নতুন তেল। আমরা কী কিনছি, কোথায় কিনছি, কবে কিনছি – এইসব তথ্য গোপন থাকলেও তার প্যাটার্নগুলো কোম্পানিগুলো ব্যবহার করে।
- কোন শহরে কোন প্রোডাক্ট বেশি বিক্রি হচ্ছে।
- বছরের কোন সময়ে কোন জিনিসের চাহিদা বাড়ছে।
- কোন বয়সের মানুষ কী ধরনের পরিষেবা নিচ্ছে।
👉 এই বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ করে তারা বিভিন্ন কোম্পানিকে মার্কেট রিসার্চ রিপোর্ট দেয়, যার জন্য মোটা টাকা নেওয়া হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, এই কোম্পানিগুলো আপনার ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করে না। বরং ডেটাকে সামগ্রিকভাবে ব্যবহার করে ব্যবসার কৌশল তৈরি করে।
আয়ের তৃতীয় উৎস: ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস
প্রথম দিকে Google Pay বা PhonePe ছিল কেবল টাকা পাঠানোর অ্যাপ। কিন্তু এখন তারা ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ফিনান্সিয়াল সুপার অ্যাপে।
আজ আপনি এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করে করতে পারেন:
- হেলথ বা লাইফ ইনস্যুরেন্স কেনা
- পার্সোনাল লোন নেওয়া
- ডিজিটালি সোনা কেনা
- মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা
👉 উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি ফোন পে থেকে হেলথ ইনস্যুরেন্স কিনেন, ফোন পে সেই ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন পায়। ফলে যত বেশি ইউজার এই পরিষেবাগুলো ব্যবহার করে, কোম্পানির আয় তত দ্রুত বাড়ে।
এটাই এখন তাদের আসল লাভজনক ব্যবসা।
আয়ের চতুর্থ উৎস: স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ
ফিনটেক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে।
- সিনেমা টিকিট বুকিং প্ল্যাটফর্ম
- ফুড ডেলিভারি অ্যাপ
- ই-কমার্স সাইট
- ব্যাংক ও এনবিএফসি
👉 উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি Google Pay দিয়ে সিনেমার টিকিট কাটেন, তাহলে টিকিট বিক্রেতা প্ল্যাটফর্মকে আয়ের একটি অংশ Google Pay-কে কমিশন হিসেবে দিতে হয়।
এই পার্টনারশিপের মাধ্যমে তারা আরও বড় আয়ের রাস্তা খুলে রাখে।
আয়ের পঞ্চম উৎস: ইকোসিস্টেম তৈরি
সবশেষে, তাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো ইকোসিস্টেম তৈরি করা।
- যত বেশি মানুষ তাদের অ্যাপ ব্যবহার করবে, ভবিষ্যতে তত বেশি পরিষেবা তারা চালু করতে পারবে।
- একবার আপনি Google Pay বা PhonePe ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, ব্যাংকিং, শপিং, বিনিয়োগ – সবই আপনি তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকেই করবেন।
👉 ফলে আজ তারা আমাদের ফ্রি পরিষেবা দিয়ে ইউজার সংখ্যা বাড়াচ্ছে, আর ভবিষ্যতে এই ইউজার বেসই হবে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তাহলে প্রশ্ন হলো – এই মডেল কতদিন টিকবে?
আরবিআই গভর্নর শাক্তিকান্ত দাস ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই বলেছেন যে, দীর্ঘদিন এই মডেল ফ্রি থাকা সম্ভব নয়। কারণ—
- সার্ভার চালানো, সাইবার সিকিউরিটি বজায় রাখা, অ্যাপ আপডেট করা – এসবের জন্য বিপুল খরচ হয়।
- শুধুমাত্র মার্চেন্ট কমিশন বা ডেটা অ্যানালিটিক্সের উপর নির্ভর করলে টেকসই হবে না।
- ভবিষ্যতে গ্রাহকদের কাছ থেকেও সামান্য সার্ভিস চার্জ নেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ আপাতত ইউপিআই আমাদের জন্য ফ্রি, কিন্তু আগামী দিনে হয়তো ফোন বের করে স্ক্যান করার সময় একটু হলেও চার্জ দিতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইউপিআই অ্যাপগুলো আমাদের কাছ থেকে টাকা নেয় না, কিন্তু দোকানদারদের কমিশন, ডেটা ব্যবহার, ইনস্যুরেন্স ও লোন বিক্রি, বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে পার্টনারশিপ – সব মিলিয়ে তারা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে।
আজকের দিনে UPI কেবল একটা পেমেন্ট সিস্টেম নয়, বরং একটা বিশাল ফিনান্সিয়াল ইকোসিস্টেম। আর এই ইকোসিস্টেমেই ভবিষ্যতের অর্থনীতি গড়ে উঠবে।