আদালতে পুজো অনুমতি বিতর্ক: ঐতিহ্য, আইন আর ভবিষ্যৎ

ভারতের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এক বিরাট সামাজিক উদযাপন। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি পাড়ায়, ক্লাবে, সংগঠনে দুর্গাপূজা আয়োজন হয়। তবে এই উৎসবকে ঘিরে প্রায়শই দেখা দেয় জমি সংক্রান্ত বিতর্ক, অনুমতির জটিলতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে এক শুনানি এমনই এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরল, যেখানে স্থানীয় ক্লাবের পুজো আয়োজনকে কেন্দ্র করে আদালতে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

প্রেক্ষাপট

মামলার মূল কেন্দ্র দক্ষিণ ২৪ পরগনার মহেশতলা অঞ্চলের এক শিশু উদ্যান (চিলড্রেনস পার্ক)। এই ভূমি মূলত শরণার্থী পুনর্বাসন প্রকল্পের অংশ হিসেবে বরাদ্দ হয়েছিল এবং পরবর্তীতে শিশুদের খেলার মাঠ হিসেবেই নথিভুক্ত থাকে। কিন্তু স্থানীয় পৌরসভা সেখানে একটি কমিউনিটি হল নির্মাণ করতে চেয়েছিল। এই নিয়ে ২০১৭ সালে একটি জনস্বার্থ মামলা হয় এবং আদালত জানায় যে, ভূমির প্রকৃতি পরিবর্তন করা যেতে পারে শুধুমাত্র আইনানুগ প্রক্রিয়ায়।

এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় একটি ক্লাব বহু বছর ধরে দুর্গাপূজা ও কালীপূজার অনুমতি নিয়ে ঐ পার্কে উৎসব আয়োজন করে আসছে। তাদের দাবি, ২০০৭ সাল থেকে তারা নিয়মিত অনুমতি পেয়ে আসছে এবং এর প্রমাণস্বরূপ তারা পূর্ববর্তী অনুমতির নথিও আদালতে পেশ করেছে।

আদালতে শুনানি: দুই পক্ষের বক্তব্য

সাম্প্রতিক শুনানিতে পিটিশনার পক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন যে—

  • তাদের ক্লাব গত দেড় দশক ধরে পুজোর অনুমতি পেয়ে আসছে।
  • পূর্ববর্তী অনুমতির কপি আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
  • কোনো নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব বা সংগঠন একই জায়গায় অনুমতি চায়নি।
  • ২০২৫ সালেও তারা পৌরসভা ও এসডিও (সাব-ডিভিশনাল অফিসার)-এর কাছে আবেদন করেছে, কিন্তু অনুমতি মেলেনি।

অন্যদিকে পৌরসভার পক্ষের আইনজীবী ভিন্ন সুর তোলে। তাদের বক্তব্য:

  • এ জায়গা নিয়ে মামলাটি এখনও ডিভিশন বেঞ্চে বিচারাধীন এবং ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে চূড়ান্ত শুনানি হবে।
  • এই জমিতে পৌরসভা ইতিমধ্যেই কমিউনিটি হল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে, এমনকি কন্ট্রাক্টরও ঠিক করা হয়েছে (যদিও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি)।
  • ক্লাবটি তাদের প্রকৃত ঠিকানা, নথি ও অনুমতি সম্পর্কে আদালতের নজরে সঠিক তথ্য সবসময় তুলে ধরেনি।
  • যদি আদালত পৌরসভার পক্ষে রায় দেয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ কাজ শুরু হবে এবং তখন আর ক্লাবের পুজো আয়োজন করা সম্ভব হবে না।

বিচারপতির পর্যবেক্ষণ

আদালত পুরো শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক স্পষ্ট করেন—

  1. ছবির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন – ক্লাব কর্তৃক জমা দেওয়া ছবিগুলো থেকে নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে না যে এগুলো আসলেই তাদের পুজোর ছবি কি না। তাই নথিভিত্তিক প্রমাণই বেশি গুরুত্ব পাবে।
  2. অস্থায়ী অনুমতির সীমাবদ্ধতা – পুজো অনুমতি কখনোই স্থায়ী অধিকার তৈরি করে না। এটি কেবল একটি অস্থায়ী ছাড়, যা উৎসব শেষে সমাপ্ত হয়ে যায়।
  3. কমিউনিটি হল নির্মাণ নিয়ে দ্বন্দ্ব – আদালত স্পষ্ট করে জানায় যে, এ মামলার মূল প্রশ্ন পুজো অনুমতি, কমিউনিটি হল নির্মাণ নয়। তবে যেহেতু মূল মামলাটি ডিভিশন বেঞ্চে বিচারাধীন, তাই এর ফলাফলের উপর পুজো অনুমতি নির্ভরশীল হতে পারে।
  4. সময়ের গুরুত্ব – আদালত লক্ষ্য করেন যে দুর্গাপূজা শুরু হতে এখনও প্রায় তিন সপ্তাহ বাকি আছে। ফলে ২ সেপ্টেম্বর মামলার শুনানি শেষে ৩ সেপ্টেম্বর আবার পুজো অনুমতির আবেদন শোনা যাবে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

এই মামলাটি শুধু একটি আইনি জটিলতা নয়, বরং বাংলার সামাজিক চেতনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। দুর্গাপূজা পাড়ার মানুষকে একত্রিত করে, সামাজিক মেলবন্ধন ঘটায় এবং অর্থনীতিতেও বিরাট ভূমিকা রাখে। স্থানীয় দোকানপাট, শিল্পী, আলো, মণ্ডপশিল্পী—সবাই এর সঙ্গে জড়িত। ফলে কোনো ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে যে পার্কে পুজো করে আসছে, হঠাৎ সেখানে অনুমতি না পাওয়া স্থানীয় জনমানসে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে পৌরসভারও যুক্তি রয়েছে। তারা যদি শিশু উদ্যানের জায়গায় একটি কমিউনিটি হল তৈরি করতে পারে, তবে তা সারা বছর নানা কাজে ব্যবহার হবে—সামাজিক অনুষ্ঠান, বিবাহ, শিক্ষামূলক কার্যক্রম ইত্যাদিতে। ফলে জনস্বার্থের যুক্তিও এখানে প্রযোজ্য।

আইন বনাম ঐতিহ্য

এখানেই মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়—আইনের চোখে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন ও অনুমতি সংক্রান্ত প্রক্রিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ, না কি বহু বছরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য?

  • যদি আইনের কড়াকড়ি মেনে চলা হয়, তবে পৌরসভা আদালতের অনুমোদন নিয়ে যেকোনো সময় কমিউনিটি হল নির্মাণ শুরু করতে পারে।
  • আবার যদি সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়, তবে দুর্গাপূজা আয়োজনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

আদালতকে তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হচ্ছে।

সম্ভাব্য সমাধান

এই ধরনের মামলার একটি যুক্তিসঙ্গত সমাধান হতে পারে:

  1. অস্থায়ী অনুমতি বজায় রাখা – যতদিন পর্যন্ত মূল মামলার রায় না হয়, ততদিন ক্লাবকে পুজো করার জন্য সাময়িক অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
  2. দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা – পৌরসভা যদি সত্যিই কমিউনিটি হল তৈরি করতে চায়, তবে বিকল্প জমিতে ক্লাবের পুজো আয়োজনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
  3. আলোচনা ও সমঝোতা – আদালতের বাইরে স্থানীয় প্রশাসন, ক্লাব এবং পৌরসভার মধ্যে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হলে হয়তো সবার জন্য গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে।

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার মানুষের প্রাণের উৎসব। আইনি প্রক্রিয়া অবশ্যই মানতে হবে, কিন্তু ঐতিহ্যকে একেবারে অস্বীকার করলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আদালতের এই মামলায় তাই বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আইন, সামাজিক প্রয়োজন আর সাংস্কৃতিক আবেগ—এই তিনটির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা।

২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে যখন ডিভিশন বেঞ্চে মূল মামলার শুনানি হবে, তখনই স্পষ্ট হবে জমির ভবিষ্যৎ। তবে আদালত ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে পুজো অনুমতি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে। এখন দেখার বিষয়—বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা কি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় পার্কেই হবে, নাকি কমিউনিটি হলের ছায়ায় নতুন অধ্যায় শুরু হবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url