 |
Calcutta University File |
আজকের এই যুগে, যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক আখড়া বানানোর প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে, তখন একজন অন্তর্বর্তী উপাচার্যের সাহসিক অবস্থান আমাদের সকলকে ভাবিয়ে তোলে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তী উপাচার্য শান্তা দত্ত দে-কে 'বেয়নী রাক্ষসী' বলে আখ্যা দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্রপরিষদের (টিএমসিপি) রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অভিরূপ চক্রবর্তী। কারণ? তিনি ২৮ আগস্ট পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করতে অস্বীকার করেছেন, যা টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবসের সঙ্গে মিলে গেছে। এই ঘটনা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এই সম্পাদকীয়তে আমরা এই ঘটনার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব, তার পটভূমি খতিয়ে দেখব এবং এর বৃহত্তর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব। শিক্ষা কি রাজনীতির দাসত্ব করবে, নাকি তার স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব আমরা।
প্রথমেই ঘটনার সূত্রপাত বুঝে নেওয়া যাক। ২৮ আগস্ট, ২০২৫ – এই তারিখটি টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে পরিচিত। এই দিনে ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সভা-সমিতি এবং র্যালি হয়। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসারে, এই তারিখে সেমিস্টার পরীক্ষা নির্ধারিত। প্রায় ৩০,০০০ ছাত্রছাত্রী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। অন্তর্বর্তী উপাচার্য শান্তা দত্ত দে এই তারিখ পরিবর্তন করতে অস্বীকার করেছেন, যুক্তি দেখিয়ে যে একাডেমিক ক্যালেন্ডার তিন মাস আগে ঠিক করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের জন্য তা বদলানো যাবে না। এতে করে টিএমসিপির নেতৃত্ব ক্ষুব্ধ হয়েছে। অভিরূপ চক্রবর্তী বলেছেন, "উপাচার্য শান্তা দত্ত বেয়নী রাক্ষসী নাম করেই বলছি, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তার রাজনৈতিক প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে ২৮ আগস্ট পরীক্ষার দিন ফেলেছে।" তিনি আরও বলেছেন, "এত বড় বেহায়া আমি জীবনে দেখিনি।" এমনকি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে "২৮ আগস্টের পরে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নেব" এবং "গণতান্ত্রিকভাবে এমন থাপ্পড় মারব যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না।"
এই ভাষা কি একজন ছাত্র নেতার যোগ্য? এটি কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যায়? অভিরূপ চক্রবর্তী যিনি নিজেকে ছাত্র হিসেবে দাবি করেন, তার এই কথাগুলো শুধু অসভ্যতার পরিচয় দেয় না, বরং রাজনৈতিক চাপের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। তিনি উপাচার্যের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যার উত্তরে শান্তা দত্ত বলেছেন, "আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কারা যেন ঘেউ ঘেউ করছে।" এতে অভিরূপের প্রতিক্রিয়া: "আপনাকে বলছি শান্তাদেবী, আপনি এত ঘেউ ঘেউ করা বলবেন না। তাহলে কিন্তু আপনি রাজ্যপালের কাছে গিয়ে কতবার ম্যাও ম্যাও করেছেন সেই কথা আমরা সকলের সামনে তুলে ধরবো।" এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে তিনি কি ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, নাকি রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছেন?
এখন প্রশ্ন উঠছে, উপাচার্যের রাজনৈতিক প্রভু কারা? অভিরূপের অভিযোগ যে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই তারিখ ঠিক করেছেন, কিন্তু বাস্তবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার সরকারি ছুটি এবং অন্যান্য বিষয় দেখে তৈরি হয়। শান্তা দত্ত বলেছেন, "যদি আমি আজ একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠা দিবস মানি, তাহলে আমাকে প্রত্যেকেরটা মানতে হবে। এসএফআই, এআইডিএসও, বিজেপির ছাত্র সংগঠন – সবাই বলতে পারে তাদের দিনে পরীক্ষা রাখা যাবে না। তাহলে পরীক্ষা নেওয়া যাবে কি?" এই যুক্তি অকাট্য। রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা থামিয়ে রাখা যায় না।
এই ঘটনার পটভূমি আরও গভীর। গত বছর, ২০২৪ সালে, টিএমসিপি উপাচার্যের গাড়ির বনেটে উঠে নাচানাচি করেছে, বিক্ষোভ দেখিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে যে শান্তা দত্ত 'বেয়নীভাবে' পদে বসে আছেন। বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে গিয়েছে, যেখানে বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছেন যে উপাচার্যের প্রবেশ-প্রস্থানে বাধা দেওয়া যাবে না। এবারও একই ধরনের চাপ। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে অনুরোধ এসেছে পরীক্ষা স্থগিত করার জন্য। কিন্তু উপাচার্য অটল। তিনি বলেছেন, "লাস্ট-মিনিট রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্টেবল নয়।" অন্যদিকে, বোলপুরের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (ভুল করে বিশ্ববাংলা বলা হয়েছে কিছু রিপোর্টে) পরীক্ষা ২৮ থেকে ৩০ আগস্টে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন করবে না? কারণ, এটি স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন।
শান্তা দত্ত দের অবস্থানকে অনেকে প্রশংসা করেছেন। বিরোধী দলের নেতা এবং শিক্ষাবিদরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় স্ট্যান্ড। উদাহরণস্বরূপ, আরজি কর আন্দোলনের সময় (২০২৪ সালে) তিনি ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, "উৎসবে ফিরুন।" কিন্তু শান্তা দত্ত বলেছিলেন, "আমাদের ছেলেমেয়েরা অনশন করছেন, তাদের দেখে আসুন। ওরা আমাদের থেকে বয়সে ছোট, ওদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।" এতে টিএমসিপি ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেই রাগ এখন প্রকাশ পাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন, এই আক্রমণের মুখে একজন মানুষ কতটা একা লড়াই করতে পারেন? শান্তা দত্ত একা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর উপর চাপ আসছে কলেজ অধ্যক্ষদের থেকে, যারা চিঠি লিখে বলছেন পরীক্ষা বদল করুন। বঙ্গবাসী ইভনিং কলেজ, সুরেন্দ্রনাথ ইভনিং কলেজ এবং সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজ থেকে এমন অনুরোধ এসেছে। ছাত্ররা, শিক্ষকরা, নন-টিচিং স্টাফ – সবাই চাপ দিচ্ছে। কিন্তু উপাচার্য বলছেন, "পরীক্ষা কি পিকনিক যে অংশগ্রহণ করব না বলা যায়? অধ্যক্ষরা যদি এটাকে সমর্থন করেন, তাহলে ডিসিপ্লিন থাকবে না।"
এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা তুলে ধরে। রাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘদিনের। ২০১১ সাল থেকে
তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর, টিএমসিপি অনেক কলেজের ছাত্র ইউনিয়নে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪৫টি অধিভুক্ত কলেজের ৯০ শতাংশে তাদের প্রভাব। এতে করে শিক্ষা রাজনীতির দাস হয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যখন টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবসে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু এবার উপাচার্য অটল।
শান্তা দত্তের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি বলেছেন, "ডাক না পাওয়ার মতো বায়োডাটা নয় আমার। আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবিত একমাত্র ব্যক্তি যার ছয়টা মেডেল আছে। বেস্ট গ্র্যাজুয়েট অফ দা ইয়ার, ইউনিভার্সিটি গোল্ড মেডেল, পিএইচডি, দু'বছর হেড অফ ডিপার্টমেন্ট, তিনবার ডিন, ২০ বছর ইউজি বোর্ড চেয়ারম্যান, তিন পিজি বোর্ডে, আট বছর আইসিসি প্রিসাইডিং অফিসার।" এত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তাঁকে স্থায়ী উপাচার্যের ইন্টারভিউতে ডাকা হয়নি। ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৩ জন ডাক পেয়েছেন, কিন্তু তিনি নয়। তিনি বলছেন, "এটা কনস্পিরেসি ছাড়া কী?" সম্ভবত এই অবস্থানের জন্যই তাঁকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনার বৃহত্তর প্রভাব কী? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি রাজনৈতিক চাপে নতি স্বীকার করে, তাহলে ছাত্রদের ভবিষ্যত বিপন্ন হবে। পরীক্ষা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের জন্য স্থগিত হলে, শিক্ষার মান কমবে। এটি গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীন চিন্তার কেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গে এমন অনেক উদাহরণ আছে – যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, প্রেসিডেন্সিতে ছাত্র ইউনিয়ন নিয়ে টানাপোড়েন। সরকারের উচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত রাখা, না যে রাজনৈতিক লাভের জন্য ব্যবহার করা।
অন্যদিকে,
টিএমসিপির এই চাপ কি ন্যায়সঙ্গত? তারা বলছে, ২৮ আগস্টে যানজট হবে, ছাত্ররা পরীক্ষায় যেতে পারবে না। কিন্তু উপাচার্যের উত্তর: "বন্ধের দিন সরকার সবকিছু সচল রাখে, তাহলে এই দিন কেন পারবে না?" সত্যিই, প্রশাসন যদি সঠিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সমস্যা হবে না। এটি কেবল অজুহাত।
শেষে, এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে সত্যের পথে দাঁড়াতে গেলে অনেক আক্রমণ সহ্য করতে হয়। শান্তা দত্ত একা লড়ছেন, কিন্তু তাঁর অবস্থান অনেককে অনুপ্রাণিত করবে। সমাজ হিসেবে আমাদের উচিত এমন ব্যক্তিদের সমর্থন করা। রাজনীতি শিক্ষাকে গ্রাস করলে, দেশের ভবিষ্যত অন্ধকার। আশা করি, আদালত এবং জনমত এই স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করবে। যেমন কবিতায় বলা, "একাই চোখের জল মুছে সবাই, সমাজ কবিতা লিখে শীত দাঁড়ায়।" কিন্তু সময় এসেছে, আমরা সকলে দাঁড়াই।