 |
Justice or Control? The Growing Shadow of Government over the Judiciary |
ভারতীয় বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে একের পর এক ঘটনার মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি বিচারপতিদের বদলি, নিয়োগ এবং রায়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে, যা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার উপর ছায়া ফেলছে। সুপ্রিম কোর্ট এবং বিভিন্ন হাইকোর্টের ঘটনাবলী নিয়ে সংবাদমাধ্যমে চলছে তীব্র আলোচনা। এই প্রতিবেদনে আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করছি।
কে ছিলেন সেই বিচারপতি? জাতীয় কোম্পানি আইন আপিল ট্রাইব্যুনালে (এনসিএলএটি) বিচারিক সদস্য বিচারপতি শরদ কুমার শর্মা একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, উচ্চ বিচারব্যবস্থার একজন সম্মানিত সদস্য তাঁদের বেঞ্চের একজন সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি কোম্পানির পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। এই ঘটনা হায়দ্রাবাদের কেএলএসআর ইনফ্রাটেক নামক কোম্পানির মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে একজন পরিচালক এএস রেড্ডির সাসপেনশনের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি হচ্ছিল। শুনানি শেষ হয়ে ১৮ জুন রায় সংরক্ষিত হয়েছিল। বিচারপতি শর্মা এই অভিযোগের পর নিজেকে এই মামলার শুনানি থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট এই ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, এবং সুপ্রিম কোর্টের সেক্রেটারি জেনারেলকে এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে জানা যাবে, কোন বিচারপতি এই ফোন করেছিলেন এবং তা সুপ্রিম কোর্ট না হাইকোর্টের কোনো বিচারপতি ছিলেন কিনা। এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার উপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় অভিযুক্ত আইনজীবী সুরেন্দ্র গাড়লিং গত সাত বছর ধরে জেলে রয়েছেন, কিন্তু তাঁর জামিনের আবেদন এখনো মঞ্জুর হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি ১৭ বার স্থগিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ বার বিচারপতি এম এম সুন্দরেশের বেঞ্চের সামনে এসেছে। সাংবাদিক সৌরভ দাস তাঁর একটি প্রতিবেদনে এই মামলাকে 'কাফকায়েস্ক ফাইল' বলে বর্ণনা করেছেন, যেখানে মামলাটি তালিকায় উঠে আসে, তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়, বা শুনানি স্থগিত হয়। ফ্রানৎস কাফকার উপন্যাস *দ্য ট্রায়াল*-এর সঙ্গে তুলনা করে তিনি এই প্রক্রিয়াকে বিচারের একটি বিড়ম্বনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সৌরভ দাসের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিচারপতি সুন্দরেশ নিজেকে এই মামলার শুনানি থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এখন এই মামলা অন্য একটি বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হবে। এই ঘটনা বিচারব্যবস্থায় ন্যায়ের জন্য নাগরিকদের কতটা অপেক্ষা করতে হয়, তা তুলে ধরেছে।
পাটনা হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস বিপুল পঞ্চোলির সুপ্রিম কোর্টে প্রোমোশনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিবি নাগরত্না আপত্তি তুলেছেন। তিনি কলেজিয়ামের পাঁচ বিচারপতির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, যেখানে বিচারপতি পঞ্চোলি এবং বোম্বে হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস আলোক আরাধের সুপ্রিম কোর্টে প্রোমোশনের প্রস্তাব মঞ্জুর হয়েছে। বিচারপতি নাগরত্না চান তাঁর এই আপত্তি সর্বজনীন করা হোক, যাতে জনগণ জানতে পারে তিনি কেন এই নিয়োগের বিরোধিতা করছেন। প্রাক্তন বিচারপতি অভয় এস ওকাও বলেছেন, কলেজিয়ামে যদি কোনো বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেন, তবে তা স্বচ্ছতার স্বার্থে প্রকাশ করা উচিত।
বিচারপতি নাগরত্নার আপত্তির মূল কারণ হলো বিচারপতি পঞ্চোলির দ্রুত বদলি এবং প্রোমোশন। তিনি ২০১৪ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত গুজরাট হাইকোর্টে বিচারপতি ছিলেন। ২৪ জুলাই ২০২৩-এ তাঁকে পাটনা হাইকোর্টে বদলি করা হয় এবং ২১ জুলাই ২০২৫-এ তিনি পাটনা হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস হন। মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁকে সুপ্রিম কোর্টে প্রোমোশন দেওয়ার প্রস্তাব আসে। বিচারপতি নাগরত্না এবং বিচারপতি বিক্রমনাথ এই প্রোমোশনের ক্ষেত্রে তাঁর সিনিয়রিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, গুজরাট হাইকোর্টে বিচারপতি পঞ্চোলির চেয়ে বেশ কয়েকজন সিনিয়র বিচারপতি রয়েছেন, যাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। এছাড়া, সুপ্রিম কোর্টে গুজরাটের প্রতিনিধিত্ব অন্য হাইকোর্টের তুলনায় বেশি হয়ে যাবে। এই নিয়োগের ফলে বিচারপতি পঞ্চোলি ২০৩১-৩৩ সালের মধ্যে প্রায় দুই বছরের জন্য ভারতের চিফ জাস্টিস হতে পারেন, যা বিচারপতি নাগরত্না মনে করেন বিচার ব্যবস্থার প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং তাঁর টুইটে উল্লেখ করেছেন যে, বিচারপতি পঞ্চোলির চেয়ে তিনজন মহিলা বিচারপতি—সুনীতা অগ্রবাল, রেবতী মোহিতে ডেরে এবং লিজা গিল—সিনিয়র, কিন্তু তাঁদের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেছেন, ২০২১ সালে তৎকালীন চিফ জাস্টিস এনভি রমনা তিনজন মহিলা বিচারপতি—হিমা কোহলি, বিবি নাগরত্না এবং বেলা ত্রিবেদী—কে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তারপর থেকে আজ পর্যন্ত একজনও মহিলা বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে নিযুক্ত হননি। এই সময়ে চারজন চিফ জাস্টিস মোট ২৮ জন বিচারপতি নিয়োগ করেছেন, কিন্তু একজন মহিলাও তাতে ছিলেন না। এটি বিচারব্যবস্থায় মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
উড়িষ্যা হাইকোর্টের প্রাক্তন চিফ জাস্টিস এস মুরলীধর সম্পাদিত বই *ইনকমপ্লিট জাস্টিস: সুপ্রিম কোর্ট অ্যাট ৭৫* সম্প্রতি দিল্লিতে প্রকাশিত হয়েছে। এই বইয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মদন বি লোকুর উল্লেখ করেছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার কলেজিয়ামকে বারবার বিচারপতি মুরলীধরের বদলির জন্য চাপ দিয়েছিল। বিচারপতি লোকুরের অসম্মতির কারণে তাঁর বদলি রুখে দেওয়া গিয়েছিল। কিন্তু লোকুর অবসর নেওয়ার পর সরকার আবার এই দাবি তুললে বিচারপতি এ কে সিক্রি বিরোধিতা করেন। সিক্রি অবসর নেওয়ার পরই ২০২০ সালে বিচারপতি মুরলীধরকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বদলি করা হয়।
এই বদলির সময়কাল উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালে দিল্লি দাঙ্গার মামলায় বিচারপতি মুরলীধর এবং বিচারপতি তলওয়ান্ত সিংয়ের বেঞ্চ দিল্লি পুলিশকে তিরস্কার করে জানতে চেয়েছিল কেন বিজেপির নেতা অনুরাগ ঠাকুর, পরভেশ ভর্মা, অভয় ভর্মা এবং কপিল মিশ্রের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তৃতার জন্য মামলা দায়ের করা হয়নি। সেই দিনই সন্ধ্যায় মুরলীধরের বদলির আদেশ জারি হয়। দিল্লি হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এই বদলির নিন্দা করে এবং পরের দিন আইনজীবীরা প্রতিবাদে কাজ বন্ধ রাখেন। এই ঘটনা বিচারপতিদের সাহসী রায়ের জন্য রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগকে শক্তিশালী করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি অতুল শ্রীধরনকে ছত্তিশগড় হাইকোর্টে বদলি করেছে। মাত্র চার মাস আগে তাঁকে জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্ট থেকে মধ্যপ্রদেশে বদলি করা হয়েছিল। *আর্টিকল ১৪*-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জম্মু-কাশ্মীরে বিচারপতি শ্রীধরন সরকারের জবাবদিহি তলব করেছিলেন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছিলেন। তিনি ২৬ দিনের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস হতে পারতেন, কিন্তু তখনই তাঁর বদলি হয়ে যায়। এই ঘন ঘন বদলি বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার উপর প্রশ্ন তুলছে।
সম্প্রতি বিজেপির প্রাক্তন মুখপাত্র আরতি অরুণ সাঠেকে বোম্বে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিজেপির মুখপাত্রের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে বলেছেন, এতে আইনগতভাবে কোনো ভুল নেই, কিন্তু এটি মর্যাদার প্রশ্ন। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক থাকা ব্যক্তির বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ জনগণের বিশ্বাসের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি চিত্তরঞ্জন দাস অবসরের সময় বলেছেন, তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে আরএসএসের ভূমিকা ছিল এবং তিনি এখনো আরএসএসের সদস্য। তবে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর বিচারিক কাজে কখনো পক্ষপাতিত্ব হয়নি। এই ধরনের বক্তব্য বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করছে।
ভারতীয় বিচারব্যবস্থা একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিচারপতি মুরলীধরের বদলি, বিচারপতি পঞ্চোলির নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, সুরেন্দ্র গাড়লিংয়ের জামিনের শুনানির বিলম্ব—এই সবই বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলছে। বিচারপতি বিবি নাগরত্না এবং অভয় ওকার মতো বিচারপতিরা স্বচ্ছতার পক্ষে কথা বলছেন, যা আশার আলো। কিন্তু বিচারব্যবস্থার উপর রাজনৈতিক চাপ এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া জনগণের বিশ্বাস ক্ষুণ্ন করছে। সাংবাদিক সৌরভ দাসের মতো ব্যক্তিরা এই অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছেন। ভারতের বিচারব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হলে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং মর্যাদার একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।