উৎসব না রাজনৈতিক বার্তা? তৃণমূল ছাত্রপরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস ঘিরে বিতর্ক

তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্রপরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস ঘিরে রাজনীতির রঙ স্পষ্ট। একদিকে দলীয় শক্তি প্রদর্শন ও ছাত্র রাজনীতির বার্তা, অন্যদিকে বিরোধীদের সমালোচনা ও প্রশ্ন। উৎসবের আবহে আদর্শ, সমালোচনা ও বাস্তবতার সংঘাতে দিনটি পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক তাৎপর্যের প্রতীক।
Source: theweek.in

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে ছাত্র রাজনীতি সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ছাত্রপরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলি প্রতিবছরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ২৮শে আগস্ট, ২০২৫-এর এই অনুষ্ঠানটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দিনটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সভা নয়, বরং ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন, শিক্ষা, রাজনীতির প্রভাব এবং সমাজের বাস্তবতার একটি আয়না। এই অনুষ্ঠানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতাদের বক্তব্য, ছাত্রদের অংশগ্রহণ এবং পটভূমিতে চলমান ঘটনাবলী যেমন আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা, শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা এবং ভোটের হিসাব-নিকাশ—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল ছবি উঠে আসে।

এই আর্টিকেলে আমরা এই অনুষ্ঠানের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করব। প্রথমত, ছাত্রদের উদ্দেশ্যে দেওয়া সতর্কবাণী এবং রাজনীতির প্রভাব; দ্বিতীয়ত, অনুষ্ঠানের আয়োজকদের দানের আহ্বান; তৃতীয়ত, টিএমসিপির ইতিহাস এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক; চতুর্থত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের গভীরতা; পঞ্চমত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য এবং নতুন শব্দাবলীর উত্থান; এবং শেষে, শিক্ষা, নিয়োগ এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা দেখব কীভাবে রাজনীতি এবং শিক্ষা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এবং ছাত্রসমাজের উপর তার প্রভাব পড়ে।

ছাত্রদের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী: রাজনীতি vs শিক্ষা

অনুষ্ঠানের শুরুতেই একটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে। যদি কোনো ছাত্র বা ছাত্রী পরীক্ষা ছেড়ে দিয়ে টিএমসিপির অনুষ্ঠানে যোগ দেয়, তাহলে তাদের ভবিষ্যত কী হবে? বক্তা স্পষ্ট করে বলেছেন যে এমন ছাত্ররা বড় হয়ে সিভিক ভলেন্টিয়ারের চাকরি পেতে পারে, কিন্তু তার থেকে বেশি কিছু নয়। এটি একটি কটাক্ষমূলক বক্তব্য, যা রাজনীতির লোভে শিক্ষাকে অবহেলা করার পরিণামকে তুলে ধরে। বক্তা আরও বলেছেন যে এটি যেকোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য—যদি ছাত্ররা পরীক্ষার থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে তাদের জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

এই বার্তাটি বাস্তবতার আলোকে খুবই প্রাসঙ্গিক। পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র রাজনীতি প্রায়শই শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ২৮শে আগস্টের পরীক্ষার দিনে অনেক কলেজে ছাত্ররা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য পরীক্ষা এড়িয়ে গেছে। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধা দেয়। বক্তা এখানে "বখাটে ছেলেমেয়েদের এন্টারপ্রাইজ" বলে কটাক্ষ করেছেন, যা রাজনৈতিক দলগুলির ছাত্র সংগঠনগুলিকে ইঙ্গিত করে যা প্রায়শই অরাজনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। এই সমালোচনা সকল দলের প্রতি সমানভাবে প্রযোজ্য, যা বক্তার নিরপেক্ষতা দেখায়।

এই অংশটি ছাত্রসমাজকে চিন্তা করতে বাধ্য করে: রাজনীতি কি শিক্ষার পরিপূরক, নাকি বাধা? পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনগুলি (যেমন নকশালবাড়ি আন্দোলন) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে এটি প্রায়শই ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বক্তার এই সতর্কবাণী ছাত্রদের জীবনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে, যেখানে রাজনীতি চাকরির সুযোগ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু বাস্তবে এটি সীমিত ফল দেয়।

দানের আহ্বান: অনুষ্ঠানের পিছনে অর্থনীতি

অনুষ্ঠানের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো দর্শকদের উদ্দেশ্যে দানের আহ্বান। বক্তা বলেছেন যে ভিডিওর নিচে একটি "থ্যাংকস" বাটন রয়েছে, যার মাধ্যমে আর্থিক সাহায্য করা যায়। এটিকে কৌতুকময়ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: ১ টাকা দিলে স্যারিডন, ২ টাকা দিলে লজেন্স, ১০ টাকা দিলে ফাইভ স্টার চকলেট, ২৫০ টাকা দিলে বিরিয়ানি এবং ৩০০ টাকা দিলে বিরিয়ানির সঙ্গে ফিরনি। এটি অনুষ্ঠান আয়োজনের পিছনে থাকা "ট্রামা" বা চাপের পুরস্কার হিসেবে বর্ণিত।

এই অংশটি আধুনিক মিডিয়া এবং রাজনৈতিক কনটেন্টের অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরে। ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা প্রায়শই দানের উপর নির্ভর করে। কিন্তু এখানে এটি রাজনৈতিক সমালোচনার সঙ্গে যুক্ত, যা কনটেন্টের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বক্তা বলেছেন যে এই অনুষ্ঠান করার জন্য তাদের টিম অনেক চাপের মধ্যে দিয়ে গেছে, যা সম্ভবত রাজনৈতিক চাপ বা সমালোচনাকে ইঙ্গিত করে। এই দানের আহ্বান কনটেন্টের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য দেখায়।

এটি আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ফান্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলি প্রায়শই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সমর্থন সংগ্রহ করে, কিন্তু এখানে এটি একটি সমালোচনামূলক কনটেন্টের অংশ। এই অংশটি পাঠকদের চিন্তা করতে বাধ্য করে যে রাজনৈতিক আলোচনা কতটা অর্থনির্ভর।

টিএমসিপির ইতিহাস: কংগ্রেস থেকে হাইজ্যাক?

অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবসের উৎপত্তি। বক্তা স্পষ্ট করে বলেছেন যে টেকনিক্যালি টিএমসিপির কোনো প্রতিষ্ঠা দিবস নেই—এটি আসলে কংগ্রেসের ছাত্রপরিষদের দিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে টিএমসি গঠন করার পর এই দিনটিকে "হাইজ্যাক" করেছেন। এমনকি কংগ্রেসের স্লোগানও কপি করা হয়েছে।

এই তথ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অংশ। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে টিএমসি গঠন করেন, এবং অনেক উপাদান কংগ্রেস থেকে নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে টিএমসি বড় করে পালন করলেও, কংগ্রেস ছোট্ট সভা করে তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়। এটি রাজনৈতিক পরিচয়ের লড়াই দেখায়।

বক্তার এই বিশ্লেষণ "হাইজ্যাক" শব্দটি ব্যবহার করে, যা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি পাঠকদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক সংগঠনগুলি প্রায়শই ঐতিহ্যকে নিজের করে নেয়, যা অস্তিত্বের লড়াইয়ের অংশ।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য: রিয়েলাইজেশন এবং সমালোচনা

অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য। তাঁর প্রথম "রিয়েলাইজেশন" ছিল আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা নিয়ে। তিনি বলেছেন যে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য বিচার নয়, বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি "ওয়ার্ল্ড ক্লাস" স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া। টিএমসি অপরাজিতা বিল নিয়ে এসেছে, যাতে ধর্ষণকারীদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু বক্তা সমালোচনা করেছেন যে বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায়, এবং প্রশাসনের সমস্যা (যেমন পুলিশের অসহযোগিতা) উপেক্ষা করা হয়েছে।

এছাড়া, মনোজিতের ঘটনা (টিএমসিপির নেতা) নিয়ে কোনো কথা নেই, এবং হাসপাতালে ভাঙচুরকারীদের শনাক্ত করা হয়নি। বক্তা কটাক্ষ করে বলেছেন যে টিএমসি "ভেঙে দাও" নয়, "সাজিয়ে দাও" করে—যা পঞ্চায়েত নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত।

দ্বিতীয় রিয়েলাইজেশন: টিএমসিকে কেউ ভালোবাসে না, সবাই বিপক্ষে (বিচার ব্যবস্থা, ইডি, সিবিআই, ইলেকশন কমিশন, বিজেপি)। কিন্তু বাংলার ১০ কোটি মানুষ তাদের পক্ষে। বক্তা এটি খণ্ডন করে ভোটের হিসাব দিয়েছেন: লোকসভায় টিএমসি ২.৭৫ কোটি ভোট পেয়েছে, বিজেপি ২.৩৩ কোটি। ১০ কোটি থেকে বিজেপির সমর্থক বাদ দিলে সাড়ে সাত কোটি, অন্যান্য দলের দেড় কোটি বাদ দিলে ছয় কোটি, যার মধ্যে ২.৭৫ কোটি ভোটার, বাকি তিন কোটি "কেয়ার করে না"। এটি অভিষেকের দাবির অতিরঞ্জন দেখায়।

তৃতীয় রিয়েলাইজেশন: তিনি দিল্লিতে শ্রমিকদের বকেয়া টাকার জন্য আন্দোলন করেছেন, কিন্তু সফল হননি। মমতা রাজ্যের কোষাগার থেকে টাকা দিয়েছেন। তবু তিনি আবার আন্দোলন করবেন। বক্তা প্রশ্ন তোলেন যে ব্যর্থতার পর আবার কেন?

এই বিশ্লেষণ অভিষেকের বক্তব্যের দুর্বলতা তুলে ধরে, যা রাজনৈতিক নেতাদের দাবি এবং বাস্তবের মধ্যে ফারাক দেখায়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য: কবিতা, দুষ্টুমি এবং মিষ্টিমি
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের আগে ইন্দ্রনীল সেনের গানের ভূমিকা ছিল, যাকে বক্তা "বুম বক্স" বলে কটাক্ষ করেছেন। মমতা নিজের লেখা গান শুনে মুগ্ধ হয়ে গেছেন, গায়ে কাঁটা দিয়েছে—যা রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের স্তরে তুলে ধরে। এটি আত্মপ্রশংসার উদাহরণ।

তাঁর বক্তব্যে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সমালোচনা: গবেষকদের টাকা বন্ধ করা "দুষ্টুমি"। কিন্তু রাজ্যের গ্রান্টের সমস্যা উপেক্ষা করা হয়েছে। নতুন শব্দ "মিষ্টিমি" উদ্ভাবন: দলের আবদার মেনে চলা মিষ্টিমি, না মানলে দুষ্টুমি। উদাহরণ: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শান্তা দত্তের পরীক্ষা না বদলানো দুষ্টুমি; সুরেন্দ্রনাথ ইভনিং কলেজের অধ্যক্ষের পোশাক বিলি মিষ্টিমি।

তাঁর ছাত্র রাজনীতির স্মৃতি: সিপিএম আমলে মারধর, ৪৬ সেলাই, হাতের অর্ধেক হার, বন্দুক নিয়ে তাড়া—যা "জীবন্ত লাশ" হিসেবে বর্ণিত। এটি ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা।

শিক্ষা নিয়ে: জয়েন্টের ফল দেরি হওয়া মামলার দোষ, না রাজ্যের। কিন্তু SSC মামলা, ২৬,০০০ চাকরি হারানো, ২০১৭ টেটের মামলা উল্লেখ করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের ভৎসনা এবং অযোগ্যদের তালিকা প্রকাশের নির্দেশ উল্লেখযোগ্য।

এই অংশ মমতার বক্তব্যের সৃজনশীলতা এবং সমালোচনা দেখায়, কিন্তু বাস্তব সমস্যা উপেক্ষা করে।

শিক্ষা, নিয়োগ এবং ভবিষ্যত

অনুষ্ঠানে শিক্ষা নিয়ে কম কথা হয়েছে, যা আশ্চর্যজনক নয়। OBC মামলার কারণে জয়েন্টের ফল দেরি, কিন্তু রাজ্যের দোষ অস্বীকার। SSC-এর মামলায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ দেখায় যে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গন্ডগোল রয়েছে।

ছাত্ররা যারা অনুষ্ঠানে গিয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকে পড়াশোনা করতে চান। এই বয়স সাহসের, কিন্তু বক্তব্যগুলি যদি মাপকাঠি হয়, তাহলে ভবিষ্যত উজ্জ্বল নয়। বক্তা আশা করেছেন যে তারা রাজ্যের মুখ উজ্জ্বল করবে, কিন্তু রাজনীতির প্রভাবে তা চ্যালেঞ্জিং।

এই অনুষ্ঠানটি রাজনীতি এবং শিক্ষার মধ্যে সংঘাত দেখায়। টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবস কংগ্রেসের ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত, কিন্তু আজ এটি রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ। অভিষেক এবং মমতার বক্তব্য সমালোচনা সত্ত্বেও ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা, কিন্তু বাস্তব সমস্যা (ধর্ষণ, নিয়োগ, স্বাস্থ্য) উপেক্ষা করে। ছাত্ররা যদি শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে ভবিষ্যত উজ্জ্বল হতে পারে। এই আর্টিকেলটি সেই আশা নিয়ে শেষ করছি।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url